তৃতীয় খণ্ড - দ্বিতীয় অধ্যায়: ভাব, সমাধি ও দর্শন সম্বন্ধে কয়েকটি কথা
ঠাকুরের নির্বিকল্প ভূমিতে সর্বদা থাকিবার সঙ্কল্প ও উক্ত ভূমির স্বরূপ
এগার মাস দক্ষিণেশ্বরে অবস্থান করিয়া শ্রীমৎ তোতাপুরী চলিয়া গেলেন। ঠাকুরের তখন দৃঢ়সঙ্কল্প হইল - 'আমি আমার' রাজ্যে আর না থাকিয়া নিরন্তর শ্রীভগবানের সহিত একত্বানুভবে বা অদ্বৈতজ্ঞানে অবস্থান করিব এবং তিনি তদ্রূপ আচরণও করিতে লাগিলেন। সে বড় অপূর্ব কথা - তখন ঠাকুরের শরীরটা যে আছে, সে বিষয়ের আদৌ হুঁশ ছিল না। খাইব, শুইব, শৌচাদি করিব - এসকল কথারও মনে উদয় হইত না তো অপরের সহিত কথাবার্তা কহিব - সে তো অনেক দূরের কথা! সে অবস্থায় 'আমি আমার'ও নাই - আর 'তুমি তোমার'ও নাই! 'দুই' নাই; 'এক'ও নাই! কারণ, 'দুই'-এর স্মৃতি থাকিলে তবে তো 'একে'র উপলব্ধি হইবে। সেখানে মনের সব বৃত্তি স্থির - শান্ত! কেবল -
কিমপি সততবোধং কেবলানন্দরূপং
নিরুপমমতিবেলং নিত্যমুক্তং নিরীহম্।
নিরবধিগগনাভং নিষ্কলং নির্বিকল্পং
হৃদি কলয়তি বিদ্বান্ ব্রহ্মপূর্ণং সমাধৌ॥
প্রকৃতি-বিকৃতিশূন্যং ভাবনাতীতভাবং।1
* * * * *
কেবল আনন্দ! আনন্দ! - তার দিক নাই, দেশ নাই, আলম্বন নাই, রূপ নাই, নাম নাই। কেবল অশরীরী আত্মা আপনার অনির্বচনীয় আনন্দময় অবস্থায়, মনবুদ্ধির গোচরে অবস্থিত যতপ্রকার ভাবরাশি আছে, সেসকলের অতীত একপ্রকার ভাবাতীত ভাবে অবস্থিত! যাহাকে শাস্ত্র 'আত্মায় আত্মায় রমণ' বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন! - এইপ্রকার এক অনির্বচনীয় অবস্থার উপলব্ধি ঠাকুরের তখন নিরন্তর হইয়াছিল।
1. বিবেকচূড়ামণি, ৪০৮-০৯।↩