Prev | Up | Next

চতুর্থ খণ্ড - প্রথম অধ্যায়: বৈষ্ণবচরণ ও গৌরীর কথা

২য় দৃষ্টান্ত - কামারপুকুরে এক সের মিষ্টান্ন ও মুড়ি খাওয়া

ম্যালেরিয়ার প্রথমাগমন ও প্রকোপে 'সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা' বঙ্গের অধিকাংশ প্রদেশ, বিশেষতঃ রাঢ়ভূমি বিধ্বস্ত ও জনশূন্য হইবার পূর্বাবধি হুগলী, বর্ধমান প্রভৃতি জেলাসকলের স্বাস্থ্য যে ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশসকলের অপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন ছিল না, এ কথা এখনও প্রাচীনদিগের মুখে শুনিতে পাওয়া যায়। তাঁহারা বলেন, লোকে তখন বর্ধমান প্রভৃতি স্থানে বায়ুপরিবর্তনে যাইত। কামারপুকুর বর্ধমান হইতে বার-তের ক্রোশ দূরে অবস্থিত। ঐ স্থানের জলবায়ুও তখন বিশেষ স্বাস্থ্যকর ছিল। দ্বাদশ বৎসর অদৃষ্টপূর্ব কঠোর তপস্যায় এবং পরেও নিরন্তর শরীরের দিকে লক্ষ্য না রাখিয়া 'ভাবমুখ'-এ থাকায় ঠাকুরের বজ্রসম দৃঢ় শরীরও যে ক্রমে ক্রমে শারীরিক পরিশ্রমে অপটু এবং কখনও কখনও প্রবল-রোগাক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, এ কথা আমরা পূর্বেই বলিয়াছি। সেজন্য ঠাকুর সাধনকালের অন্তে প্রতি বৎসর চাতুর্মাস্যের সময়টা জন্মভূমি কামারপুকুর অঞ্চলেই কাটাইয়া আসিতেন। পরম অনুগত সেবক ভাগিনেয় হৃদয় তাঁহার সঙ্গে যাইত এবং মথুরবাবু, যাওয়া-আসার সমস্ত খরচ ছাড়া পল্লীগ্রামে তাঁহার কোন বিষয়ের পাছে অভাব হয়, এজন্য সংসারের আবশ্যকীয় যত কিছু পদার্থ তাঁহার সঙ্গে পাঠাইয়া দিতেন। শুনিয়াছি লোকে নিজ কন্যাকে প্রথম শ্বশুরালয়ে পাঠাইবার কালে যেমন প্রদীপের সলতেটি এবং আহারান্তে ব্যবহার্য খড়কে-কাঠিটি পর্যন্ত সঙ্গে দিয়া থাকে, মথুরবাবু ও তাঁহার পরম ভক্তিমতী গৃহিণী শ্রীমতী জগদম্বা দাসী ঠাকুরকে কামারপুকুরে পাঠাইবার কালে অনেক সময় সেইরূপভাবে 'ঘর বসত' সঙ্গে দিয়া পাঠাইয়া দিতেন। কারণ এ কথা তাঁহাদের অবিদিত ছিল না যে, কামারপুকুরে ঠাকুরের সংসার যেন শিবের সংসার। সঞ্চয়ের নামগন্ধ ঠাকুরের পিতৃ-পিতামহের কাল হইতেই ছিল না। সৎপথে থাকিয়া যাহা জোটে তাহাই খাওয়া এবং ৺রঘুবীরের নামে প্রদত্ত দেড় বিঘা মাত্র জমিতে যে ধান্য হয় তাহাতেই সমস্ত বৎসর সংসার চালানো ঐ পরিবারের রীতি ছিল! পল্লীর মুদির দোকানই এ পবিত্র দেব-সংসারের ভাণ্ডার-স্বরূপ। যদি বিদায়-আদায়ে কিছু পয়সা-কড়ি পাওয়া গেল তবেই সে ভাণ্ডার হইতে সংসারের ব্যবহার্য তরি-তরকারি তৈল-লবণাদি সেদিনকার মতো বাহির হইল, নতুবা পুষ্করিণীর পাড়ের অযত্নলভ্য শাকান্নে আনন্দে জীবনধারণ। আর সর্বসময়ে সকল বিষয়ে যা করেন জীবন্ত জাগ্রত কুলদেবতা ৺রঘুবীর। ঐসকল কথা জানা ছিল বলিয়াই মথুরবাবুর কয়েক বিঘা ধান্যজমি শ্রীশ্রীরঘুবীরের নামে ক্রয় করিয়া দিবার আগ্রহ এবং ঠাকুরকে দেশে পাঠাইবার কালে সংসারের আবশ্যকীয় সকল পদার্থ ঠাকুরের সঙ্গে পাঠানো।

পূর্বেই বলিয়াছি, ঠাকুর চাতুর্মাস্যের সময় তখন কামারপুকুরে আসিতেন। প্রায় প্রতি বৎসরই আসিতেন। ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের সময় এইরূপে এক বৎসর আসিয়া জ্বররোগে বিশেষ কষ্ট পান - তদবধি আর দেশে যাইবেন না সঙ্কল্প করেন এবং আর তথায় গমনও করেন নাই। ঠাকুরের তিরোভাবের আট-দশ বৎসর পূর্বে তিনি ঐরূপ সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। যাহা হউক, এ বৎসর তিনি পূর্ব পূর্ব বারের ন্যায় কামারপুকুরে আসিয়া অবস্থান করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিবার ও তাঁহার ধর্মালাপ শুনিবার জন্য বাটীতে প্রতিবেশী স্ত্রীপুরুষের ভিড় লাগিয়াই আছে। আনন্দের হাট-বাজার বসিয়াছে। বাটীর স্ত্রীলোকেরা তাঁহাকে পাইয়া মনের আনন্দে তাঁহার এবং তাঁহাকে দেখিতে সমাগত সকলের সেবা-পরিচর্যায় নিযুক্ত আছেন। দিনের পর দিন, সুখের দিন কোথা দিয়া যে কাটিয়া যাইতেছে তাহা কাহারও অনুভব হইতেছে না। বাটীতে তখন ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীযুক্ত রামলালদাদার পূজনীয়া মাতাঠাকুরানীই গৃহিণীস্বরূপে ছিলেন এবং তাঁহার কন্যা শ্রীমতী লক্ষ্মীদিদি ও পরমারাধ্যা শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী বাস করিতেছিলেন।

রাত্রি প্রায় এক প্রহর হইয়াছে। প্রতিবেশী স্ত্রীপুরুষেরা রাত্রের মতো বিদায় গ্রহণ করিয়া নিজ নিজ বাটীতে প্রস্থান করিয়াছেন। ঠাকুরের কয়েক দিন হইতে অগ্নিমান্দ্য ও পেটের অসুখ হইয়াছে, সেজন্য রাত্রে সাগু-বার্লি ভিন্ন অন্য কিছুই খান না। আজও রাত্রে দুধ-বার্লি খাইয়া শয়ন করিলেন। বাটীর স্ত্রীলোকেরা তাঁহার আহার ও শয়নের পর নিজেরা আহারাদি করিলেন এবং রাত্রিতে করণীয় সংসারের কাজ-কর্ম সারিয়া এইবার শয়নের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন।

সহসা ঠাকুর তাঁহার শয়নগৃহের দ্বার খুলিয়া ভাবাবেশে টলমল করিতে করিতে বাহিরে আসিলেন এবং রামলালদাদার মাতা প্রভৃতিকে আহ্বান করিয়া বলিতে লাগিলেন - "তোমরা সব শুলে যে? আমাকে কিছু খেতে না দিয়ে শুলে যে?"

রামলালের মাতা - ওমা, সে কি গো? তুমি যে এই খেলে?

ঠাকুর - কৈ খেলুম? আমি তো এই দক্ষিণেশ্বর থেকে আসচি - কৈ খাওয়ালে?

স্ত্রীলোকেরা সকলে অবাক হইয়া পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলেন। বুঝিলেন, ঠাকুর ভাবাবেশে ঐরূপ বলিতেছেন। কিন্তু উপায়? ঘরে এখন আর এমন কোনরূপ খাদ্যদ্রব্যই নাই যাহা ঠাকুরকে খাইতে দিতে পারেন! এখন উপায়? কাজেই রামলালদাদার মাতাকে ভয়ে ভয়ে বলিতে হইল - "ঘরে এখন তো আর কিছু খাবার নেই, কেবল মুড়ি আছে। তা মুড়ি খাবে? দুটি খাও না। তাতে পেটের অসুখ করবে না।" এই বলিয়া থালে করিয়া মুড়ি আনিয়া ঠাকুরের সম্মুখে রাখিলেন। ঠাকুর তাহা দেখিয়া বালকের ন্যায় রাগ করিয়া পশ্চাৎ ফিরিয়া বসিলেন ও বলিতে লাগিলেন - "শুধু মুড়ি আমি খাব না।" অনেক বুঝানো হইল - "তোমার পেটের অসুখ, অপর কিছু তো খাওয়া চলবে না; আর দোকান-পসারও এ রাত্রে সব বন্ধ - সাগু-বার্লি যে কিনে এনে করে দেব তারও জো নেই। আজ এই দুটি খেয়ে থাক, কাল সকালে উঠেই ঝোল-ভাত রেঁধে দেব" ইত্যাদি; কিন্তু সে কথা শুনে কে? অভিমানী আবদেরে বালকের ন্যায় ঠাকুরের সেই একই কথা - "ও আমি খাব না।"

কাজেই রামলালদাদা তখন বাহিরে যাইয়া ডাকাডাকি করিয়া দোকানির ঘুম ভাঙাইলেন এবং এক সের মিঠাই কিনিয়া আনিলেন। সেই এক সের মিষ্টান্ন এবং সহজ লোকে যত খাইতে পারে তদপেক্ষা অধিক মুড়ি থালে ঢালিয়া দেওয়া হইলে তবে ঠাকুর আনন্দ করিয়া খাইতে বসিলেন এবং উহার সকলই নিঃশেষে খাইয়া ফেলিলেন। তখন বাটীর সকলের ভয় - 'এই পেট-রোগা মানুষ, মাসের মধ্যে অর্ধেক দিন সাগু-বার্লি খেয়ে থাকা, আর এই রাত্রে এই সব খাওয়া! কাল একটা কাণ্ড হবে আর কি!' কিন্তু কি আশ্চর্য, দেখা গেল পরদিন ঠাকুরের শরীর বেশ আছে, রাত্রে খাইবার জন্য কোনরূপ অসুস্থতাই নাই।

Prev | Up | Next


Go to top