Prev | Up | Next

চতুর্থ খণ্ড - প্রথম অধ্যায়: বৈষ্ণবচরণ ও গৌরীর কথা

কর্তাভজাদি মতে সাধ্য ও সাধনবিধি-সম্বন্ধে উপদেশ

কর্তাভজা প্রভৃতি সম্প্রদায়ের ঈশ্বর, মুক্তি, সংযম, ত্যাগ, প্রেম প্রভৃতি বিষয়ক কয়েকটি কথার এখানে উল্লেখ করিলেই পাঠক আমাদের পূর্বোক্ত কথা সহজে বুঝিতে পারিবেন। ঠাকুর ঐসকল সম্প্রদায়ের কথা বলিতে বলিতে অনেক সময় এগুলি আমাদের বলিতেন। সরল ভাষায় ও ছন্দোবদ্ধে লিপিবদ্ধ হইয়া উহারা অশিক্ষিত জনসাধারণের ঐসকল বিষয় বুঝিবার কতদূর সহায়তা করে, তাহা পাঠক ঐসকল শ্রবণ করিলেই বুঝিতে পারিবেন। ঐসকল সম্প্রদায়ের লোকে ঈশ্বরকে 'আলেকলতা' বলিয়া নির্দেশ করেন। বলা বাহুল্য, সংস্কৃত 'অলক্ষ্য' কথাটি হইতেই 'আলেক্' কথাটির উৎপত্তি। ঐ 'আলেক্' শুদ্ধসত্ত্ব মানবমনে প্রবিষ্ট বা তদবলম্বনে প্রকাশিত হইয়া 'কর্তা' বা 'গুরু'রূপে আবির্ভূত হন। ঐরূপ মানবকে ইঁহারা 'সহজ' উপাধি দিয়া থাকেন। যথার্থ গুরুভাবে ভাবিত মানবই এ সম্প্রদায়ের উপাস্য বলিয়া নির্দিষ্ট হওয়ায় উহার নাম 'কর্তাভজা' হইয়াছে। 'আলেকলতার' স্বরূপ ও বিশুদ্ধ মানবে আবেশ সম্বন্ধে ইঁহারা এইরূপ বলেন -

আলেকে আসে, আলেকে যায়,
আলেকের দেখা কেউ না পায়।
আলেককে চিনিছে যেই,
তিন লোকের ঠাকুর সেই।

'সহজ' মানুষের লক্ষণ - তিনি 'অটুট' হইয়া থাকেন অর্থাৎ রমণীর সঙ্গে সর্বদা থাকিলেও তাঁহার কখনো কামভাবে ধৈর্যচ্যুতি হয় না।

এই সম্বন্ধে ইঁহারা বলেন -

রমণীর সঙ্গে থাকে, না করে রমণ।

সংসারে কামকাঞ্চনের ভিতর অনাসক্তভাবে না থাকিলে সাধক আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করিতে পারে না, সেজন্য সাধকদিগের প্রতি উপদেশ -

রাঁধুনি হইবি, ব্যঞ্জন বাঁটিবি, হাঁড়ি না ছুঁইবি তায়।
সাপের মুখেতে ভেকেরে নাচাবি, সাপ না গিলিবে তায়।
অমিয়-সাগরে সিনান করিবি, কেশ না ভিজিবে তায়।

তন্ত্রের ভিতর সাধকদিগের যেমন পশু, বীর ও দিব্যভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা আছে, ইঁহাদের ভিতরেও তেমনি সাধকদিগের উচ্চাবচ শ্রেণীর কথা আছে -

'আউল, বাউল, দরবেশ, সাঁই -
সাঁইয়ের পর আর নাই।'

অর্থাৎ সিদ্ধ হইলে তবে মানব সাঁই হইয়া থাকে।

ঠাকুর বলিতেন, "ইঁহারা সকলে ঈশ্বরের 'অরূপ রূপ'-এর ভজন করেন" এবং ঐ সম্প্রদায়ের কয়েকটি গানও আমাদের নিকট অনেক সময় গাহিতেন। যথা -

বাউলের সুর।
ডুব্ ডুব্ ডুব্ রূপসাগরে আমার মন।
তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবিরে প্রেমরত্নধন॥
(ওরে) খোঁজ্ খোঁজ্ খোঁজ্ খুঁজলে পাবি, হৃদয়মাঝে বৃন্দাবন।
(আবার) দীপ্ দীপ্ দীপ্ জ্ঞানের বাতি হৃদে জ্বলবে অনুক্ষণ॥
ড্যাং ড্যাং ড্যাং ডাঙ্গায় ডিঙ্গি, চালায় আবার সে কোন্ জন?
কুবীর বলে শোন্ শোন্ শোন্ ভাব গুরুর শ্রীচরণ॥

এইরূপে গুরুর উপাসনা ও সকলে একত্রিত হইয়া ভজনাদিতে নিবিষ্ট থাকা - ইহাই তাঁহাদের প্রধান সাধন। ইঁহারা দেবদেবীর মূর্ত্যাদি অস্বীকার না করিলেও উপাসনা বড় একটা করেন না। ভারতে গুরু বা আচার্যের উপাসনা অতীব প্রাচীন; উপনিষদের কাল হইতেই প্রবর্তিত বলিয়া বোধ হয়। কারণ উপনিষদেই রহিয়াছে "আচার্যদেবো ভব"। তখন দেবদেবীর উপাসনা আদৌ প্রচলিত হয় নাই বলিয়াই বোধ হয়। সেই আচার্যোপাসনা কালে ভারতে কতরূপ মূর্তি ধারণ করিয়াছে দেখিয়া আশ্চর্য হইতে হয়।

এতদ্ভিন্ন শুচি-অশুচি, ভাল-মন্দ প্রভৃতি ভেদজ্ঞান মন হইতে ত্যাগ করিবার জন্য নানা প্রকারের অনুষ্ঠানও সাধককে করিতে হয়। ঠাকুর বলিতেন, সেসকল সাধকেরা গুরুপরম্পরায় অবগত হইয়া থাকেন। ঠাকুর তাহারও কিছু কিছু কখনও কখনও উল্লেখ করিতেন।

Prev | Up | Next


Go to top