চতুর্থ খণ্ড - প্রথম অধ্যায়: বৈষ্ণবচরণ ও গৌরীর কথা
অবতারপুরুষেরা সর্বদা শাস্ত্রমর্যাদা রক্ষা করেন; সকল ধর্মমতকে সম্মান করা সম্বন্ধে ঠাকুরের শিক্ষা
ঈশ্বরাবতার মহাপুরুষেরা পূর্ব পূর্ব শাস্ত্রসকলের মর্যাদা সম্যক রক্ষা করিয়া তাঁহাদের প্রবর্তিত বিধানের অবিরোধী কোন নূতন পথের সংবাদই যে ধর্মজগতে আনিয়া দেন, এ কথা আর বলিয়া বুঝাইতে হইবে না। যে-কোন অবতার-পুরুষের জীবনালোচনা করিলেই উহা বুঝিতে পারা যায়। বর্তমান যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনেও যে ঐ বিষয়ের অক্ষুণ্ণ পরিচয় আমরা সর্বদা সকল বিষয়ে পাইয়াছি, এ কথাই আমরা পাঠককে 'লীলাপ্রসঙ্গ'-এ বুঝাইতে প্রয়াসী। যদি না পারি, তবে পাঠক যেন বুঝেন উহা আমাদের একদেশী বুদ্ধির দোষেই হইতেছে - যে ঠাকুর 'যত মত তত পথ'-রূপ অদৃষ্টপূর্ব সত্য আধ্যাত্মিক জগতে প্রথম প্রকাশ করিয়া জনসাধারণকে মুগ্ধ করিয়াছেন, তাঁহার ত্রুটি বা দোষে নহে। পাশ্চাত্য নীতি - যাহার প্রয়োগ সুচতুর দুনিয়াদার পাশ্চাত্য কেবল অপর ব্যক্তি ও জাতির কার্যাকার্য-বিচারণের সময়েই বিশেষভাবে করিয়া থাকেন, নিজের কার্যকলাপ বিচার করিতে যাইয়া প্রায়ই পাল্টাইয়া দেন, সেই পাশ্চাত্য নীতির অনুসরণ করিয়া আমরা যাহাকে 'জঘন্য কর্তাভজাদি মত' বলিয়া নাসিকা কুঞ্চিত করি, ঐ কর্তাভজাদি মত হইতে শুদ্ধাদ্বৈত বেদান্তমত পর্যন্ত সকল মতই এ দেবমানব ঠাকুরের নিকট সসম্মানে ঈশ্বরলাভের পথ বলিয়া স্থানপ্রাপ্ত হইত এবং অধিকারী-বিশেষে অনুষ্ঠেয় বলিয়া নির্দিষ্টও হইত। আমরা অনেকে দ্বেষবুদ্ধিপ্রণোদিত হইয়া ঠাকুরকে অনেক সময় জিজ্ঞাসা করিয়াছি - 'মহাশয়, অত বড় উচ্চদরের সাধিকা ব্রাহ্মণী পঞ্চ-মকার লইয়া সাধন করিতেন, এটা কিরূপ? অথবা অত বড় উচ্চদরের ভক্ত সুপণ্ডিত বৈষ্ণবচরণ পরকীয়া-গ্রহণে বিরত হন নাই - এ তো বড় খারাপ?'
ঠাকুরও তাহাতে বারংবার আমাদের বলিয়াছেন, "ওতে ওদের দোষ নেই রে! ওরা ষোল আনা মন দিয়ে বিশ্বাস করত, ঐটেই ঈশ্বরলাভের পথ। ঈশ্বরলাভ হবে বলে যে যেটা সরলভাবে প্রাণের সহিত বিশ্বাস করে অনুষ্ঠান করে, সেটাকে খারাপ বলতে নেই, নিন্দা করতে নেই। কারও ভাব নষ্ট করতে নেই। কেন-না যে-কোন একটা ভাব ঠিক ঠিক ধরলে তা থেকেই ভাবময় ভগবানকে পাওয়া যায়। যে যার ভাব ধরে তাঁকে (ঈশ্বরকে) ডেকে যা। আর, কারো ভাবের নিন্দা করিসনি, বা অপরের ভাবটা নিজের বলে ধরতে যাসনি।" এই বলিয়াই সদানন্দময় ঠাকুর অনেক সময় গাহিতেন -
আপনাতে আপনি থেকো, যেও না মন কারু ঘরে।
যা চাবি তাই বসে পাবি, খোঁজ নিজ অন্তঃপুরে॥
পরম ধন সে পরশমণি, যা চাবি তাই দিতে পারে,
(ও মন) কত মণি পড়ে আছে, সে চিন্তামণির নাচদুয়ারে॥
তীর্থগমন দুঃখভ্রমণ, মন উচাটন হয়ো না রে,
(তুমি) আনন্দে ত্রিবেণী-স্নানে শীতল হও না মূলাধারে॥
কি দেখ কমলাকান্ত, মিছে বাজি এ সংসারে,
(তুমি) বাজিকরে চিনলে নাকো, যে এই ঘটের ভিতর বিরাজ করে॥