চতুর্থ খণ্ড - দ্বিতীয় অধ্যায়: গুরুভাব ও নানা সাধু সম্প্রদায়
ঠাকুরের 'সিদ্ধি' বা 'কারণ' বলিবামাত্র ঈশ্বরীয় ভাবে তন্ময় হইয়া নেশা; ও খিস্তি-খেউড়-উচ্চারণেও সমাধি
ঠাকুর 'কারণ' গ্রহণ করিতে কখনও পারিতেন না - এ প্রসঙ্গে কত কথাই না মনে উদয় হইতেছে! কতদিন না আমাদের সম্মুখে তিনি কথা-প্রসঙ্গে 'সিদ্ধি', 'কারণ' প্রভৃতি পদার্থের নাম করিতে করিতে নেশায় ভরপুর হইয়া, এমনকি সমাধিস্থ পর্যন্ত হইয়া পড়িয়াছেন - দেখিয়াছি! স্ত্রী-শরীরের বিশেষ গোপনীয় অঙ্গ, যাহার নামমাত্রেই সভ্যতাভিমানী জুয়াচোর আমাদের মনে কুৎসিত ভোগের ভাবই উদিত হয় বা ঐরূপ ভাব উদিত হইবে নিশ্চিত জানিয়া আমাদের ভিতর শিষ্ট যাঁহারা তাঁহারা 'অশ্লীল' বলিয়া কর্ণে অঙ্গুলিপ্রদানপূর্বক দূরে পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করেন, সেই অঙ্গের নাম করিতে করিতেই এ অদ্ভুত ঠাকুরকে কতদিন না সমাধিস্থ হইয়া পড়িতে দেখিয়াছি! আবার দেখিয়াছি - সমাধি-ভূমি হইতে কিছু নিম্নে নামিয়া একটু বাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়াই ঐ প্রসঙ্গে বলিতেছেন, "মা, তুইতো পঞ্চাশৎ-বর্ণ-রূপিণী; তোর যে-সব বর্ণ নিয়ে বেদ-বেদান্ত, সেই সবই তো খিস্তি-খেউড়ে! তোর বেদ-বেদান্তের ক খ আলাদা, আর খেউড়ের ক খ আলাদা তো নয়! বেদ-বেদান্তও তুই, আর খিস্তি-খেউড়ও তুই।" এই বলিতে বলিতে আবার সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন! হায়, হায়, বলা-বুঝানোর কথা দূরে যাউক, কে বুঝিবে এ অলৌকিক দেবমানবের নয়নে জগতের ভাল-মন্দ সকল পদার্থই কি অনির্বচনীয়, আমাদের মনোবুদ্ধির অগোচর, এক অপূর্ব আলোকে প্রকাশিত ছিল! কে সে চক্ষু পাইবে যে, তাঁহার ন্যায় দৃষ্টিতে জগৎ-সংসারটা দেখিতে পাইবে! হে পাঠক, অবহিত হও; স্তম্ভিত মনে কথাগুলি হৃদয়ে যত্নে ধারণ কর, আর ভাব - এ অদ্ভুত ঠাকুরের মানসিক পবিত্রতা কি সুগভীর, কি দুরবগাহ!
শ্রীশ্রীজগদম্বার কৃপাপাত্র শ্রীরামপ্রসাদ গাহিয়াছেন - "সুরাপান করি না আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে। আমার মন-মাতালে মাতাল করে, যত মদ-মাতালে মাতাল বলে" ইত্যাদি। বাস্তবিক নেশা-ভাঙ না করিয়া কেবল ভগবদানন্দে যে লোকে, আমরা যে অবস্থাকে বেয়াড়া মাতাল বলি তদ্রূপ অবস্থাপন্ন হইতে পারে, এ কথা ঠাকুরকে দেখিবার পূর্বে আমাদের ধারণাই হইত না। আমাদের বেশ মনে আছে, আমাদের জীবনে একটা সময় এমন গিয়াছে যখন 'হরি' বলিলেই মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হইত - একথা কোন গ্রন্থে পাঠ করিয়া গ্রন্থকারকে কুসংস্কারাপন্ন নির্বোধ বলিয়া ধারণা হইয়াছিল। তখন ঐ প্রকারের একটা সকল বিষয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাসের তরঙ্গ যেন শহরের সকল যুবকেরই মনে চলিতেছিল! তাহার পরেই এই অলৌকিক ঠাকুরের সহিত দেখা। দেখা, দিবসে রাত্রে সকল সময়ে দেখা, নিজের চক্ষে দেখা যে কীর্তনানন্দে তাঁহার উদ্দাম নৃত্য ও ঘন ঘন বাহ্যজ্ঞানের লোপ - টাকা পয়সা হাতে স্পর্শ করাইলেই ঐ অবস্থাপ্রাপ্তি - 'সিদ্ধি', 'কারণ' প্রভৃতি নেশার পদার্থের নাম করিবামাত্র ভগবদানন্দের উদ্দীপন হইয়া ভরপুর নেশা - ঈশ্বরের বা তদবতারদিগের নামের কথা দূরে থাক, যে নামের উচ্চারণে ইতর সাধারণের মনে কুৎসিত ইন্দ্রিয়জ আনন্দেরই উদ্দীপনা হয়, তাহাতে ব্রহ্মযোনি ত্রিজগৎপ্রসবিনী আনন্দময়ী জগদম্বার উদ্দীপন হইয়া ইন্দ্রিয়সম্পর্কমাত্রশূন্য বিমল আনন্দে একেবারে আত্মহারা হইয়া পড়া! এখনও কি বলিতে হইবে, এ অলৌকিক দেবমানবের কি এমন গুণ দেখিয়া আমাদের চক্ষু চিরকালের মতো ঝলসিত হইয়া গেল, যাহাতে তাঁহাকে ঈশ্বরাবতার-জ্ঞানে হৃদয়ে আসন দান করিলাম?