পঞ্চম খণ্ড - সপ্তম অধ্যায়: ঠাকুরের পরীক্ষাপ্রণালী ও নরেন্দ্রনাথ
ঈশ্বরলাভই জীবনের উদ্দেশ্য বুঝিয়া সকল কর্মের অনুষ্ঠান
'বিবাহ করিবার ইচ্ছা আছে কি না', 'চাকুরি করিবি কি না' - ঠাকুরের এই সকল প্রশ্নের উত্তরে আমাদিগের কেহ কেহ বলিত, "বিবাহ করিতে ইচ্ছা নাই, মহাশয়, কিন্তু চাকুরি করিতে হইবে।" অশেষ স্বাধীনতাপ্রিয় ঠাকুরের নিকটে কিন্তু ঐ কথা বিষম বিসদৃশ লাগিত। তিনি বলিতেন, "যদি বিবাহ করিয়া সংসারধর্ম পালনই করিবি না, তবে আজীবন অপরের চাকর হইয়া থাকিবি কেন?" ষোল-আনা মনপ্রাণ ঈশ্বরে সমর্পণ করিয়া তাঁহার উপাসনা কর - সংসারে জন্ম পরিগ্রহ করিয়া মানবের তদপেক্ষা মহৎ কার্য অন্য কিছুই আর হইতে পারে না এবং ঐরূপ করা একান্ত অসম্ভব বুঝিলে বিবাহ করিয়া ঈশ্বরলাভকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য স্থিরপূর্বক সৎপথে থাকিয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ কর - ইহাই তাঁহার মত ছিল। সেইজন্য আধ্যাত্মিক রাজ্যে উত্তম বা মধ্যম অধিকারী বলিয়া যে-সকল ব্যক্তিকে তিনি বুঝিতে পারিতেন তাহাদিগের কেহ বিবাহ করিয়াছে অথবা বিশেষ কারণ ব্যতীত ইতরসাধারণের ন্যায় অর্থোপার্জনের জন্য চাকুরি স্বীকারপূর্বক বা নাম-যশের প্রত্যাশী হইয়া সংসারের অন্য কোন প্রকার কার্যে নিযুক্ত হইয়া নিজ শক্তি ক্ষয় করিতেছে শুনিলে তিনি প্রাণে বিষম আঘাত প্রাপ্ত হইতেন। তাঁহার বালকভক্তদিগের অন্যতম জনৈক1 চাকুরি স্বীকার করিয়াছে শুনিয়া তিনি তাহাকে একদিন বলিয়াছিলেন, "তুই তোর বৃদ্ধা মাতার ভরণপোষণের জন্য করিতেছিস তাই, নতুবা চাকুরি গ্রহণ করিয়াছিস শুনিলে তোর মুখ দেখিতে পারিতাম না।" অপর জনৈক2 বিবাহ করিয়া কাশীপুরের বাগানে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলে, তাঁহার যেন পুত্রশোক উপস্থিত হইয়াছে এইরূপভাবে তাহার গ্রীবা ধারণপূর্বক অজস্র রোদন করিতে করিতে বারংবার বলিয়াছিলেন, "ঈশ্বরকে ভুলিয়া যেন একেবারে (সংসারে) ডুবিয়া যাসনি!"
1. স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।↩
2. ছোট নরেন্দ্র।↩