পঞ্চম খণ্ড - সপ্তম অধ্যায়: ঠাকুরের পরীক্ষাপ্রণালী ও নরেন্দ্রনাথ
অধিকারিভেদে ঠাকুরের দয়াবান্ ও নির্মম হইবার উপদেশ
ধর্মলাভ করিতে আসিয়া কোন কোন প্রকৃতিতে দয়ার ভাবটি এত অধিক পরিবর্ধিত হইয়া উঠে যে, পরিণামে উহাই তাহার বন্ধনের এবং কখনও কখনও ধর্মপথ হইতে ভ্রষ্ট হইবার কারণ হইয়া পড়ে। কোমল-হৃদয় নরনারীই অনেক সময় ঐরূপ হইয়া থাকে। ঠাকুর সেইজন্য ঐরূপ নরনারীকে কঠোর হইবার জন্য এবং তদ্বিপরীত প্রকৃতিবিশিষ্টদিগকে কোমল হইতে সর্বদা উপদেশ প্রদান করিতেন। আমাদিগের মধ্যে জনৈকের1 হৃদয় অতি কোমল ছিল। বিশিষ্ট কারণ বিদ্যমান থাকিলেও তাঁহার ক্রোধের উদয় হইতে বা তাঁহাকে রূঢ় বাক্য প্রয়োগ করিতে আমরা কখনও দেখিয়াছি কি না সন্দেহ। সম্পূর্ণ প্রকৃতিবিরুদ্ধ হইলেও এবং বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকিলেও মাতার চক্ষে জল দেখিতে না পারিয়া তিনি সহসা একদিন আপনাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছিলেন। ঠাকুরের আশ্রয় এবং আশ্বাসবাক্যই তাঁহাকে উক্ত কর্মনিবন্ধন প্রাণে দারুণ অনুতাপ ও হতাশ ভাবের উদয় হইতে সে যাত্রায় রক্ষা করিয়াছিল। ঐরূপ অযথা কোমলতা ও দয়ার ভাব সংযত করিয়া যাহাতে তিনি প্রতিকার্য বিচারপূর্বক সম্পাদন করেন তদ্বিষয়ে ঠাকুরের বিশেষ দৃষ্টি ছিল। সামান্য সামান্য বিষয়ের সহায়ে ঠাকুর কিরূপে তাঁহাকে শিক্ষাপ্রদান করিতেন, দুই-একটি ঘটনার উল্লেখেই তাহা বুঝিতে পারা যাইবে। ঠাকুরের বস্ত্রাদি যাহাতে রক্ষিত হইত তাহাতে একটি আরসোলা বাসা করিয়াছে, এক দিবস দেখিতে পাওয়া গেল। ঠাকুর বলিলেন, "আরসোলাটাকে ধরিয়া বাহিরে লইয়া গিয়া মারিয়া ফেল।" পূর্বোক্ত ব্যক্তি ঐরূপ আদেশ পাইয়া আরসোলাটাকে ধরিয়া বাহিরে লইয়া যাইলেন, কিন্তু না মারিয়া ছাড়িয়া দিয়া আসিলেন। আসিবামাত্র ঠাকুর তাঁহাকে প্রশ্ন করিলেন, "কি রে, আরসোলাটাকে মারিয়া ফেলিয়াছিস তো?" তিনি অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন, "না মহাশয়, ছাড়িয়া দিয়াছি।" ঠাকুর তাহাতে তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, "আমি তোকে মারিয়া ফেলিতে বলিলাম, তুই কি না সেটাকে ছাড়িয়া দিলি! যেমনটি করিতে বলিব ঠিক সেইরূপ করিবি, নতুবা ভবিষ্যতে গুরুতর বিষয়সকলেও নিজের মতে চলিয়া পশ্চাত্তাপ উপস্থিত হইবে।"
1. স্বামী যোগানন্দ।↩