Prev | Up | Next

পঞ্চম খণ্ড - দশম অধ্যায়: পাণিহাটির মহোৎসব

পাণিহাটির মহোৎসবের ইতিহাস

ক্রমে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী আগতপ্রায় হইল। কলিকাতার কয়েক মাইল উত্তরে অবস্থিত গঙ্গাতীরবর্তী পাণিহাটি গ্রামে প্রতি বৎসর ঐ দিবসে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বিশেষ মেলা হইয়া থাকে। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রধান পার্ষদগণের অন্যতম শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর জ্বলন্ত ত্যাগ-বৈরাগ্যের কথা বঙ্গে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। পরমা সুন্দরী স্ত্রী ও অতুল বৈভব ত্যাগপূর্বক পিতার একমাত্র পুত্র রঘুনাথ শ্রীচৈতন্যদেবের চরণাশ্রয়-মানসে যখন প্রথম শান্তিপুরে আসিয়া উপস্থিত হয়েন, তখন তিনি তাঁহাকে 'মর্কটবৈরাগ্য'1 পরিত্যাগ করিয়া কিছুকালের নিমিত্ত গৃহে অবস্থান করিতে আদেশ করিয়াছিলেন। রঘুনাথ মহাপ্রভুর ঐ আদেশ শিরোধার্য করিয়া গৃহে ফিরিয়া আসেন এবং সংসার ত্যাগ করিবার প্রবল বাসনা অন্তরে লুক্কায়িত রাখিয়া ইতরসাধারণের ন্যায় বিষয়কার্যের পরিচালনা প্রভৃতি সাংসারিক সকল বিষয়ে পিতা ও পিতৃব্যকে সাহায্য করিতে থাকেন। ঐরূপে অবস্থান করিলেও তিনি মধ্যে মধ্যে শ্রীচৈতন্য-পার্ষদগণকে না দেখিয়া থাকিতে পারিতেন না এবং পিতার অনুমতি গ্রহণপূর্বক কখনও কখনও তাঁহাদিগের নিকটে উপস্থিত হইয়া কয়েক দিবস তাঁহাদিগের পূতসঙ্গে অতিবাহিত করিয়া বাটীতে ফিরিয়া যাইতেন। ঐরূপে দিন যাইতে লাগিল এবং ত্যাগের অবসর অন্বেষণ করিয়া রঘুনাথ সংসারে কাল কাটাইতে লাগিলেন। ক্রমে শ্রীগৌরাঙ্গ সন্ন্যাস লইয়া নীলাচলে বাস করিলেন এবং শ্রীনিত্যানন্দ বৈষ্ণবধর্মপ্রচারের ভারপ্রাপ্ত হইয়া গঙ্গাতীরবর্তী খড়দহ গ্রামকে প্রধান কেন্দ্রস্বরূপ করিয়া বঙ্গের নানা স্থানে পরিভ্রমণ ও নামসঙ্কীর্তনাদি দ্বারা বহু ব্যক্তিকে উক্ত ধর্মে দীক্ষিত করিতে লাগিলেন।

সাঙ্গোপাঙ্গ-পরিবৃত শ্রীনিত্যানন্দ ধর্মপ্রচারকল্পে এক সময়ে পাণিহাটি গ্রামে অবস্থান করিবার কালে রঘুনাথ তাঁহাকে দর্শন করিতে উপস্থিত হয়েন এবং চিড়া, দধি, দুগ্ধ, শর্করা, কদলী প্রভৃতি দেবতাকে নিবেদনপূর্বক ভক্তমণ্ডলীসহ তাঁহাকে ভোজন করাইতে আদিষ্ট হয়েন। রঘুনাথ উহা সানন্দে স্বীকার করিয়া শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুকে দর্শন করিতে সমাগত শত শত ব্যক্তিকে সেই দিন ভাগীরথীতীরে ভোজনদানে পরিতৃপ্ত করেন। উৎসবান্তে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুকে প্রণামপূর্বক বিদায় গ্রহণ করিতে যাইলে তিনি ভাবাবেশে রঘুনাথকে আলিঙ্গনপূর্বক বলিয়াছিলেন, 'কাল পূর্ণ হইয়াছে, সংসার পরিত্যাগপূর্বক নীলাচলে শ্রীমহাপ্রভুর নিকটে গমন করিলে তিনি তোমাকে এখন আশ্রয় প্রদান করিবেন এবং ধর্মজীবন সম্পূর্ণ করিবার জন্য সনাতন গোস্বামীর হস্তে তোমার শিক্ষার ভার অর্পণ করিবেন।' নিত্যানন্দপ্রভুপাদের ঐরূপ আদেশে রঘুনাথের উল্লাসের অবধি রহিল না এবং বাটীতে ফিরিবার অনতিকালপরে তিনি চিরকালের মতো সংসার ত্যাগ করিয়া নীলাচলে গমন করিলেন। রঘুনাথ চলিয়া যাইলেন, কিন্তু বৈষ্ণব ভক্তগণ তাঁহার কথা চিরকাল স্মরণ রাখিয়া তদবধি প্রতি বৎসরে ঐ দিবস পাণিহাটি গ্রামে গঙ্গাতীরে সমাগত হইয়া তাঁহার ন্যায় ভগবৎপ্রসন্নতা লাভের জন্য শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুপাদের উদ্দেশ্যে ঐরূপ উৎসব সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। কালে উহা পাণিহাটির 'চিড়ার মহোৎসব' নামে ভক্ত-সমাজে খ্যাতিলাভ করিল।


1. অর্থাৎ লোক-দেখানো।

Prev | Up | Next


Go to top