পঞ্চম খণ্ড - একাদশ অধ্যায়: ঠাকুরের কলিকাতায় আগমন
পাণিহাটিতে যাইয়া গলায় বেদনাবৃদ্ধি ও বালক-স্বভাব ঠাকুরের আচরণ
পাণিহাটি মহোৎসবে যোগদান করিয়া ঠাকুরের গলায় বেদনা বৃদ্ধি হইল। সেদিন মধ্যে মধ্যে বৃষ্টি হইয়াছিল। বৃষ্টিতে ভিজিয়া আর্দ্রপদে বহুক্ষণ ভাবাবেশে অতিবাহিত করিবার ফলেই রোগ বাড়িয়াছে বলিয়া ডাক্তার ভক্তগণকে বারংবার অনুযোগ করিলেন এবং পুনরায় ঐরূপ অত্যাচার হইলে উহা কঠিন হইয়া দাঁড়াইবে বলিয়া ভয় প্রদর্শন করিতেও ছাড়িলেন না। ভক্তগণ উহাতে এখন হইতে সতর্ক থাকিতে দৃঢ়সঙ্কল্প করিলেন এবং বালক-স্বভাব ঠাকুর ঐ দিবসের অত্যাচারের সমস্ত দোষ রামচন্দ্রপ্রমুখ কয়েকজন প্রবীণ ভক্তের উপর চাপাইয়া বলিলেন, "উহারা যদি একটু জোর করিয়া আমাকে নিষেধ করিত তাহা হইলে কি আমি পাণিহাটিতে যাইতে পারিতাম।" চিকিৎসা-ব্যবসায়ী না হইলেও রামবাবু ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে পড়িয়া ডাক্তারি পাস করিয়াছিলেন। বৈষ্ণব মতের প্রতি অনুরাগবশতঃ পাণিহাটির উৎসবে যাইবার জন্য তিনিই ঠাকুরকে বিশেষ উৎসাহিত করিয়াছিলেন, সুতরাং তিনিই এখন ঐ বিষয়ে সমধিক দোষভাগী বলিয়া বিবেচিত হইলেন। আমাদিগের জনৈক বন্ধু একদিন এই সময়ে দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ঠাকুর গলদেশে প্রলেপ লাগাইয়া গৃহমধ্যে ছোট তক্তাখানির উপর চুপ করিয়া বসিয়া আছেন। তিনি বলেন, "বালককে শাসন করিবার জন্য কোন কার্য করিতে নিষেধ করিয়া এক স্থানে আবদ্ধ রাখিলে সে যেমন বিষণ্ণ হইয়া থাকে, ঠাকুরের মুখে অবিকল সেই ভাব দেখিতে পাইলাম। প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কি হইয়াছে? তিনি তাহাতে গলার প্রলেপ দেখাইয়া মৃদুস্বরে বলিলেন, 'এই দ্যাখ্ না, ব্যথা বাড়িয়াছে, ডাক্তার বেশি কথা কহিতে নিষেধ করিয়াছে।' বলিলাম, তাই তো মশায়, শুনিলাম সেদিন আপনি পেণেটি গিয়াছিলেন, বোধ হয় সেজন্যই ব্যথাটা বাড়িয়াছে। তিনি তাহাতে বালকের ন্যায় অভিমানভরে বলিতে লাগিলেন, 'হাঁ, দ্যাখ্ দেখি, এই উপরে জল, নীচে জল, আকাশে বৃষ্টি - পথে কাদা, আর রাম কি না আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে সমস্ত দিন নাচিয়ে নিয়ে এলো। সে পাসকরা ডাক্তার, যদি ভাল করে বারণ করতো তাহলে কি আমি সেখানে যাই?' আমি বলিলাম, 'তাই তো মশায়, রামের ভারী অন্যায়। যাহা হইবার হইয়া গিয়াছে, এখন কয়েকটা দিন একটু সাবধানে থাকুন, তাহা হইলেই সারিয়া যাইবে!' শুনিয়া তিনি খুশি হইলেন এবং বলিলেন, 'তা বলে একেবারে কথা বন্ধ করে কি থাকা যায়? এই দ্যাখ্ দেখি - তুই কতদূর থেকে এলি, আর আমি তোর সঙ্গে একটিও কথা কইব না, তা কি হয়?' বলিলাম, আপনাকে দেখিলেই আনন্দ হয়, কথা নাই বা কহিলেন, আমাদের কোন কষ্ট হইবে না - ভাল হউন, আবার কত কথা শুনিব। কিন্তু সেকথা শুনে কে? ডাক্তারের নিষেধ নিজের কষ্ট প্রভৃতি সকল বিষয় ভুলিয়া তিনি পূর্বের ন্যায় আমার সহিত আলাপে প্রবৃত্ত হইলেন।"