Prev | Up | Next

পঞ্চম খণ্ড - দ্বাদশ অধ্যায় - দ্বিতীয় পাদ: ঠাকুরের শ্যামপুকুরে অবস্থান

ভক্ত-সংখ্যার বৃদ্ধি; সাধনপথ নির্দেশ - সাকার ও নিরাকার চিন্তার উপযোগী আসন

শ্যামপুকুরে অবস্থানকালে ঠাকুরের শারীরিক ব্যাধি যেমন বৃদ্ধি পাইয়াছিল, তাঁহার পুণ্যদর্শন ও কৃপালাভে সমাগত জনগণের সংখ্যাও তেমনি দিন দিন বাড়িয়া গিয়াছিল। শ্রীযুক্ত হরিশচন্দ্র মুস্তফি প্রমুখ অনেক গৃহস্থভক্তের ন্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তসঙ্ঘে যিনি পরে স্বামী ত্রিগুণাতীত1 নামে সুপরিচিত হইয়াছিলেন - শ্রীযুক্ত সারদাপ্রসন্ন মিত্র2, মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত3 প্রভৃতি অনেক যুবক ভক্তেরাও এখানে ঠাকুরের প্রথমদর্শন লাভ করিয়াছিলেন। অনেকে আবার ইতিপূর্বে দুই-একবার দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিলেও এখানেই ঠাকুরের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হইবার সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। নবাগত এইসকল ব্যক্তিদিগের প্রকৃতি ও সংস্কার লক্ষ্য করিয়া ঠাকুর ইঁহাদিগের প্রত্যেককে ভক্তিপ্রধান অথবা জ্ঞানমিশ্রা ভক্তিপ্রধান সাধনমার্গ নির্দেশ করিয়া দিতেন এবং সুযোগ পাইলে নিভৃতে নানারূপ উপদেশ দিয়া ঐ পথে অগ্রসর করাইতেন। আমাদিগের জানা আছে, জনৈক যুবককে ঐরূপে ঠাকুর একদিন সাকার ও নিরাকার ধ্যানের উপযোগী নানাপ্রকার আসন ও অঙ্গসংস্থান দেখাইতেছিলেন। পদ্মাসনে উপবিষ্ট হইয়া বাম করতলের উপরে দক্ষিণকরপৃষ্ঠ সংস্থানপূর্বক ঐভাবে উভয়হস্ত বক্ষে ধারণ ও চক্ষু নিমীলন করিয়া বলিলেন, ইহাই সকলপ্রকার সাকার-ধ্যানের প্রশস্ত আসন। পরে ঐ আসনেই উপবিষ্ট থাকিয়া বাম ও দক্ষিণ হস্তদ্বয় বাম ও দক্ষিণ জানুর উপরে রক্ষাপূর্বক প্রত্যেক হস্তের অঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনীর অগ্রভাগ সংযুক্ত ও অপর সকল অঙ্গুলি ঋজু রাখিয়া এবং ভ্রূমধ্যে দৃষ্টি স্থির করিয়া বলিলেন, ইহাই নিরাকার ধ্যানের প্রশস্ত আসন। ঐ কথা বলিতে না বলিতে ঠাকুর সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন এবং কিছুক্ষণ পরে বলপূর্বক মনকে সাধারণ জ্ঞানভূমিতে নামাইয়া বলিলেন, "আর দেখানো হইল না; ঐরূপ উপবিষ্ট হইলেই উদ্দীপনা হইয়া মন তন্ময় ও সমাধিলীন হয় এবং বায়ু ঊর্ধ্বগামী হওয়ায় গলদেশের ক্ষতস্থানে আঘাত লাগে; ডাক্তার ঐজন্য সমাধি যাহাতে না হয় তাহা করিতে বিশেষ করিয়া বলিয়া গিয়াছে।" যুবক তাহাতে কাতর হইয়া বলিল, "আপনি কেন ঐসকল দেখাইতে যাইলেন, আমি তো দেখিতে চাহি নাই।" তিনি তদুত্তরে বলিলেন, "তা তো বটে, কিন্তু তোদের একটু-আধটু না বলিয়া, না দেখাইয়া থাকিতে পারি কই?" যুবক ঐ কথায় বিস্মিত হইয়া ঠাকুরের অপার করুণা এবং তাঁহার মনের অলৌকিক সমাধিপ্রবণতার কথা ভাবিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিল।


1. স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ। - ১৫ আগস্ট ২০১৯, সঙ্কলক।

2. সারদাপ্রসন্ন ১৮৮৪ খ্রীঃ-এর ডিসেম্বরের মধ্যে আসিয়াছিলেন - 'কথামৃত' ২য় ভাগ, ২১৫ পৃঃ এবং ১ম ভাগ, ৬ পৃঃ দ্রষ্টব্য। - প্রঃ

3. শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত মহাশয়ের প্রথম পরিচয় হয় এখানে। ইহার ২।৩ বৎসর পূর্বে দক্ষিণেশ্বরে কয়েকবার দর্শন করিয়াছিলেন মাত্র - তাঁহার লিখিত 'শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের পুণ্যস্মৃতি', 'উদ্বোধন', ৩৯শ বর্ষ, ভাদ্র-সংখ্যা দ্রষ্টব্য। - প্রঃ

Prev | Up | Next


Go to top