চতুর্থ খণ্ড - পঞ্চম অধ্যায়: ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ - ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের নবযাত্রা
বালকস্বভাব ঠাকুরের বালকের ন্যায় ভয়
পূর্বোক্ত ঘটনাগুলির পরে দুই-তিন দিন গত হইয়াছে! আজ পণ্ডিত শশধর ঠাকুরকে দর্শন করিতে অপরাহ্ণে দক্ষিণেশ্বর কালীবাটীতে আসিবেন। বালকস্বভাব ঠাকুরের অনেক সময় বালকের ন্যায় ভয়ও হইত। বিশেষ কোন খ্যাতনামা ব্যক্তি তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসিবেন শুনিলেই ভয় পাইতেন। ভাবিতেন, তিনি তো লেখাপড়া কিছুই জানেন না, তাহার উপর কখন কিরূপ ভাবাবেশ হয় তাহার তো কিছুই ঠিক-ঠিকানা নাই, আবার তাহার উপর ভাবের সময় নিজের শরীরেরই হুঁশ থাকে না তো পরিধেয় বস্ত্রাদির! - এরূপ অবস্থায় আগন্তুক কি ভাবিবে ও বলিবে! আমাদের মনে হইত, আগন্তুক যাহাই কেন ভাবুক না, তাহাতে তাঁহার আসিয়া গেল কি? তিনি তো নিজেই বার বার কত লোককে শিক্ষা দিতেছেন, 'লোক না পোক (কীট); লজ্জা ঘৃণা ভয় - তিন থাকতে নয়।' তবে কি ইনি নামযশের কাঙালী? কিন্তু যাচাইয়া দেখিতে যাইলেই, দেখিতাম - বালক যেমন কোন অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখিলে ভয়ে লজ্জায় জড়সড় হয়, আবার একটু পরিচয় হইলে সেই ব্যক্তিরই কাঁধে পিঠে চড়িয়া চুল টানিয়া নিঃশঙ্ক চিত্তে নানারূপ মিষ্ট অত্যাচার করে - ঠাকুরের এই ভাবটিও ঠিক তদ্রূপ। নতুবা মহারাজ যতীন্দ্রমোহন, সুবিখ্যাত কৃষ্ণদাস পাল প্রভৃতির সহিত তিনি যেরূপ স্বাধীনভাবে কথাবার্তা কহিয়াছিলেন, তাহাতে বেশ বুঝা যায় যে, নামযশের কিছুমাত্র ইচ্ছা ভিতরে থাকিলে তিনি তাঁহাদের সহিত কখনই ঐভাবে কথা কহিতে পারিতেন না।1
আবার কখনও কখনও দেখা গিয়াছে, ঠাকুর আগন্তুকের পাছে অকল্যাণ হয় ভাবিয়া ভয়ও পাইতেন। কারণ তাঁহার আচরণ ও ব্যবহার প্রভৃতি বুঝিতে পারুক বা নাই পারুক তাহাতে ঠাকুরের কিছু আসিয়া যাইত না সত্য; কিন্তু বুঝিতে না পারিয়া আগন্তুক যদি ঠাকুরের অযথা নিন্দাবাদ করিত, তাহাতে তাহারই অকল্যাণ নিশ্চিত জানিয়াই ঠাকুর ঐরূপ ভয় পাইতেন। তাই শ্রীযুত গিরিশ অভিমান-আবদারে কোন সময়ে ঠাকুরের সম্মুখে তাঁহার প্রতি নানা কটূক্তি প্রয়োগ করিলে ঠাকুর বলিয়াছিলেন, "ওরে, ও আমাকে যা বলে বলুকগে, আমার মাকে কিছু বলেনি তো?" যাক এখন সে কথা।
1. মহারাজ যতীন্দ্রমোহনকে প্রথমেই বলিয়াছিলেন, "তা বাবু, আমি কিন্তু তোমায় রাজা বলতে পারব না; মিথ্যা কথা বলব কিরূপে?" আবার মহারাজ যতীন্দ্রমোহন নিজের কথা বলিতে বলিতে যখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সহিত আপনার তুলনা করেন, তখন ঠাকুর বিশেষ বিরক্তির সহিত তাঁহার ঐরূপ বুদ্ধির নিন্দা করিয়াছিলেন। শ্রীযুত কৃষ্ণদাস পালও যখন জগতের উপকার করা ছাড়া আর কোন ধর্মই নাই ইত্যাদি বলিয়া ঠাকুরের সহিত তর্ক উত্থাপন করেন, তখন ঠাকুর বিশেষ বিরক্তির সহিত তাঁহার বুদ্ধির দোষ দর্শাইয়া দেন।↩