Prev | Up | Next

চতুর্থ খণ্ড - পঞ্চম অধ্যায়: ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ - ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের নবযাত্রা

শশধর পণ্ডিতের দ্বিতীয় দিবস ঠাকুরকে দর্শন

পণ্ডিত শশধর তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসিবেন শুনিয়া ঠাকুরের আর ভয়ের সীমা-পরিসীমা নাই। শ্রীযুত যোগেন (স্বামী যোগানন্দ), শ্রীযুত ছোট নরেন ও আর আর অনেককে বলিলেন, "ওরে, তোরা তখন (পণ্ডিতজী যখন আসিবেন) থাকিস!" ভাবটা এই যে, তিনি মূর্খ মানুষ, পণ্ডিতের সহিত কথা কহিতে কি বলিতে কি বলিবেন, তাই আমরা সব উপস্থিত থাকিয়া পণ্ডিতজীর সহিত কথাবার্তা কহিব ও ঠাকুরকে সামলাইব! আহা, সে ছেলেমানুষের মতো ভয়ের কথা অপরকে বুঝানো দুষ্কর। কিন্তু পণ্ডিত শশধর যখন বাস্তবিক উপস্থিত হইলেন, তখন ঠাকুর যেন আর একজন! হাস্যপ্রস্ফুরিতাধরে স্থির দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে দেখিতে দেখিতে তাঁহার অর্ধবাহ্যদশার মতো অবস্থা হইল এবং পণ্ডিত শশধরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, "ওগো, তুমি পণ্ডিত, তুমি কিছু বল।"

শশধর - মহাশয়, দর্শন-শাস্ত্র পড়িয়া আমার হৃদয় শুষ্ক হইয়া গিয়াছে; তাই আপনার নিকটে আসিয়াছি ভক্তিরস পাইব বলিয়া; অতএব আমি শুনি, আপনি কিছু বলুন।

ঠাকুর - আমি আর কি বলব, বাবু! সচ্চিদানন্দ যে কি (পদার্থ) তা কেউ বলতে পারে না! তাই তিনি প্রথম হলেন অর্ধনারীশ্বর। কেন? - না, দেখাবেন বলে যে পুরুষ প্রকৃতি দুই-ই আমি। তারপর তা থেকে আরও এক থাক নেবে আলাদা আলাদা পুরুষ ও আলাদা আলাদা প্রকৃতি হলেন।

ঐরূপে আরম্ভ করিয়া আধ্যাত্মিক নিগূঢ় কথাসকল বলিতে বলিতে উত্তেজিত হইয়া ঠাকুর দাঁড়াইয়া উঠিয়া পণ্ডিত শশধরকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন।

ঠাকুর - সচ্চিদানন্দে যতদিন মন না লয় হয় ততদিন তাঁকে ডাকা ও সংসারের কাজ করা দুই-ই থাকে। তারপর তাঁতে মন লয় হলে, আর কোন কাজ করবার প্রয়োজন থাকে না। যেমন ধর কীর্তন গাইছে - 'নিতাই আমার মাতা (মত্ত) হাতি।' যখন প্রথম গান ধরেছে তখন গানের কথা, সুর, তাল, মান, লয় - সকল দিকে মন রেখে ঠিক করে গাইছে। তারপর যেই গানের ভাবে মন একটু লয় হয়েছে তখন কেবল বলছে - 'মাতা হাতি, মাতা হাতি।' পরে যেই আরও মন ভাবে লয় হলো অমনি খালি বলছে - 'হাতি, হাতি।' আর, যেই মন আরও ভাবে লয় হলো অমনি 'হাতি' বলতে গিয়ে 'হা -' (বলেই হাঁ করে রইল)!

ঠাকুর ঐরূপে 'হা -' পর্যন্ত বলিয়াই ভাবাবেশে একেবারে নির্বাক নিস্পন্দ হইয়া গেলেন এবং ঐ প্রকার অবস্থায় প্রায় পনর মিনিট কাল প্রসন্নোজ্জ্বলবদনে বাহ্যজ্ঞান-শূন্য হইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। ভাবাবসানে আবার শশধরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন।

ঠাকুর - ওগো পণ্ডিত, তোমায় দেখলুম।1 তুমি বেশ লোক। গিন্নী যেমন রেঁধেবেড়ে সকলকে খাইয়ে-দাইয়ে গামছাখানা কাঁধে ফেলে পুকুরঘাটে গা ধুতে, কাপড় কাচতে যায়, আর হেঁশেল-ঘরে ফেরে না - তুমিও তেমনি সকলকে তাঁর কথা বলে কয়ে যে যাবে, আর ফিরবে না!

পণ্ডিত শশধর ঠাকুরের ঐ কথা শুনিয়া, 'সে আপনাদের অনুগ্রহ' - বলিয়া ঠাকুরের পদধূলি বারংবার গ্রহণ করিতে লাগিলেন এবং তাঁহার ঐসকল কথা শুনিতে শুনিতে স্তম্ভিত, ও আর্দ্র হৃদয়ে ভগবদ্বস্তু জীবনে লাভ হইল না ভাবিয়া অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন।


1. অর্থাৎ সমাধিসহায়ে উচ্চভূমিতে উঠিয়া তোমার অন্তরে কিরূপ পূর্বসংস্কারসকল আছে তাহা দেখিলাম।

Prev | Up | Next


Go to top