চতুর্থ খণ্ড - সপ্তম অধ্যায়: ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ - ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের পুনর্যাত্রা ও গোপালের মার শেষকথা
ঠাকুরের চারিজন রসদ্দার ও বলরামবাবুর সেবাধিকার
অলোকসামান্য মহাপুরুষদিগের অতি সামান্য নিত্যনৈমিত্তিক চেষ্টাদিতেও কেমন একটু অলৌকিকত্ব, নূতনত্ব থাকে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত যাঁহারা একদিনও সঙ্গ করিয়াছেন, তাঁহারাই এ কথার মর্ম বিশেষরূপে বুঝিবেন। বলরামবাবুর অন্ন খাইতে পারা সম্বন্ধেও একটু তলাইয়া দেখিলেই উহাই উপলব্ধি হইবে। সাধনকালে ঠাকুর এক সময় জগদম্বার নিকট প্রার্থনা করিয়া বলেন, "মা, আমাকে শুকনো সাধু করিসনি - রসে বশে রাখিস"; জগদম্বাও তাঁহাকে দেখাইয়া দেন, তাঁহার রসদ (খাদ্যাদি) যোগাইবার নিমিত্ত চারিজন রসদ্দার প্রেরিত হইয়াছে। ঠাকুর বলিতেন - ঐ চারিজনের ভিতর রানী রাসমণির জামাতা মথুরানাথ প্রথম ও শম্ভু মল্লিক দ্বিতীয় ছিলেন। সিমলার সুরেন্দ্রনাথ মিত্রকে (যাহাকে ঠাকুর কখনও 'সুরেন্দর' ও কখনও 'সুরেশ' বলিয়া ডাকিতেন) 'অর্ধেক রসদ্দার' অর্থাৎ সুরেন্দ্র পুরা একজন রসদ্দার নয় - বলিতেন; মথুরানাথের ও শম্ভুবাবুর সেবা চক্ষে দেখা আমাদের ভাগ্যে হয় নাই - কারণ, আমরা তাঁহাদের পরলোকপ্রাপ্তির অনেক পরে ঠাকুরের নিকট উপস্থিত হই। তবে ঠাকুরের মুখে শুনিয়াছি, সে এক অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। বলরামবাবুকে ঠাকুর তাঁহার রসদ্দারদিগের অন্যতম বলিয়া কখনও নির্দিষ্ট করিয়াছেন এ কথা মনে হয় না; কিন্তু তাঁহার যেরূপ সেবাধিকার দেখিয়াছি তাহা আমাদের নিকট অদ্ভুত বলিয়া বোধ হয় এবং তাহা মথুরবাবু ভিন্ন অপর রসদ্দারদিগের সেবাধিকার অপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন নহে। সেসব কথা অপর কোন সময়ে বলিবার চেষ্টা করিব। এখন এইটুকুই বলি যে, বলরামবাবু যেদিন হইতে দক্ষিণেশ্বরে গিয়াছেন, সেইদিন হইতে ঠাকুরের অদর্শন-দিন পর্যন্ত ঠাকুরের নিজের যাহা কিছু আহার্যের প্রয়োজন হইত, প্রায় সে সমস্তই যোগাইতেন - চাল, মিছরি, সুজি, সাগু, বার্লি, ভার্মিসেলি, টেপিওকা ইত্যাদি; এবং সুরেন্দ্র বা 'সুরেশ মিত্তির' দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরকে দর্শন করিবার অল্পকাল পর হইতেই ঠাকুরের সেবাদির নিমিত্ত যেসকল ভক্ত দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের নিকটে রাত্রিযাপন করিতেন, তাঁহাদের নিমিত্ত লেপ, বালিশ ও ডাল-রুটির বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছিলেন।
কি গূঢ় সম্বন্ধে যে এইসকল ব্যক্তি ঠাকুরের সহিত সম্বদ্ধ ছিলেন তাহা কে বলিতে পারে? কোন্ কারণে ইঁহারা এই উচ্চাধিকার প্রাপ্ত হন, তাহাই বা কে বলিবে? আমরা এই পর্যন্তই বুঝিয়াছি যে, ইঁহারা মহাভাগ্যবান - জগদম্বার চিহ্নিত ব্যক্তি! নতুবা লোকোত্তরপুরুষ রামকৃষ্ণদেবের বর্তমান লীলায় ইঁহারা এইরূপে বিশেষ সহায়ক হইয়া জন্মাধিকার লাভ করিতেন না! নতুবা শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত মনে ইঁহাদের মুখের ছবি এরূপ ভাবে অঙ্কিত থাকিত না, যাহাতে তিনি দর্শনমাত্রেই তা বুঝিতে পারিয়া বলিয়াছিলেন, "ইহারা এখানকার, এই বিশেষ অধিকার লইয়া আসিয়াছে!"