চতুর্থ খণ্ড - সপ্তম অধ্যায়: ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ - ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের পুনর্যাত্রা ও গোপালের মার শেষকথা
গোপালের মার ঠাকুরে ইষ্ট-বুদ্ধি দৃঢ় হইবার পর যেরূপ দর্শনাদি হইত
পূর্বে বলিয়াছি, গোপালের মার ভাবঘন গোপালমূর্তির প্রথম দর্শনের দুই মাস পরে সে দর্শন আর সদাসর্বক্ষণ হইত না। তাহাতে কেহ না মনে করিয়া বসেন যে, উহার পরে তাঁহার কালেভদ্রে কখনও গোপালমূর্তির দর্শন হইত। কারণ, প্রতি দিনই তিনি দিনের মধ্যে দুই-দশ বার গোপালের দর্শন পাইতেন। যখনই দেখিবার নিমিত্ত প্রাণ ব্যাকুল হইত তখনই পাইতেন, আবার যখনই কোন বিষয়ে তাঁহার শিক্ষার প্রয়োজন তখন গোপাল সম্মুখে সহসা আবির্ভূত হইয়া সঙ্কেতে, কথায় বা নিজে হাতেনাতে করিয়া দেখাইয়া তাঁহাকে ঐরূপ করিতে প্রবৃত্ত করিতেন। ঠাকুরের শ্রীঅঙ্গে বার বার মিশিয়া যাইয়া তাঁহাকে শিখাইয়াছিলেন তিনি ও শ্রীরামকৃষ্ণদেব অভিন্ন। খাইবার ও শুইবার জিনিস চাহিয়া-চিন্তিয়া লইয়া কিভাবে তাঁহার সেবা করা উচিত তাহা শিখাইয়াছিলেন। আবার কোন কোন বিশেষ বিশেষ শ্রীরামকৃষ্ণভক্তদিগের সহিত একত্র বিহার করিয়া বা তাঁহাদের সহিত অন্য কোনরূপ আচরণ করিয়া দেখাইয়া নিজ মাতাকে বুঝাইয়াছিলেন, ইঁহারা ও তিনি অভেদ - ভক্ত ও ভগবান এক। কাজেই তাঁহাদের ছোঁয়ান্যাপা বস্তুভোজনেও তাঁহার দ্বিধা ক্রমে ক্রমে দূর হইয়া যায়।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবে ইষ্টদেব-বুদ্ধি দৃঢ় হইবার পর হইতে আর তাঁহার বড় একটা গোপালমূর্তির দর্শন হইত না। যখন তখন শ্রীরামকৃষ্ণদেবকেই দেখিতে পাইতেন, এবং ঐ মূর্তির ভিতর দিয়াই বালগোপালরূপী ভগবান তাঁহাকে যত কিছু শিক্ষা দিতেন। প্রথম প্রথম ইহাতে তাঁহার মনে বড়ই অশান্তি হয়। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নিকট উপস্থিত হইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলেন, "গোপাল, তুমি আমায় কি করলে, আমার কি অপরাধ হলো, কেন আর আমি তোমায় আগেকার মতো (গোপালরূপে) দেখতে পাই না?" ইত্যাদি। তাহাতেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব উত্তর দেন, "ওরূপ সদাসর্বক্ষণ দর্শন হলে কলিতে শরীর থাকে না; একুশ দিন মাত্র শরীরটা থেকে তারপর শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ে যায়।" বাস্তবিক প্রথম দর্শনের পর দুই মাস গোপালের মা সর্বদাই একটা ভাবের ঘোরে থাকিতেন। রান্না-বাড়া, স্নান-আহার, জপ-ধ্যান প্রভৃতি যাহা কিছু করিতেন, সব যেন পূর্বের বহুকালের অভ্যাস ছিল ও করিতে হয় বলিয়া; তাঁহার শরীরটা অভ্যাসবশে আপনা-আপনি ঐসকল কোন রকমে সারিয়া লইত এই পর্যন্ত! কিন্তু তিনি নিজে সদাসর্বক্ষণ যেন একটা বিপরীত নেশার ঝোঁকে থাকিতেন, কাজেই এভাবে শরীর আর কয়দিন থাকে? দুই মাসও যে ছিল, ইহাই আশ্চর্য! দুই মাস পরে সে নেশার ঝোঁক অনেকটা কাটিয়া গেল। কিন্তু গোপালকে পূর্বের ন্যায় না দেখিতে পাওয়ায় আবার এক বিপরীত ব্যাকুলতা আসিল। বায়ুপ্রধান ধাত - বায়ু বাড়িয়া শরীরে বুকের ভিতর একটা দারুণ যন্ত্রণা অনুভূত হইতে লাগিল। শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে সেইজন্যই বলেন, "বাই বেড়ে বুক যেন আমার করাত দিয়ে চিরচে!" ঠাকুর তাহাতেই তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলেন, "ও তোমার হরিবাই; ও গেলে কি নিয়ে থাকবে গো? ও থাকা ভাল; যখন বেশি কষ্ট হবে তখন কিছু খেয়ো।" এই কথা বলিয়া ঠাকুর তাঁহাকে নানারূপ ভাল ভাল জিনিস সেদিন খাওয়াইয়াছিলেন।