চতুর্থ খণ্ড - পঞ্চম অধ্যায়: ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ - ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের নবযাত্রা
ঠাকুরের ভক্তদের সম্বন্ধে এত ভাবনা কেন তাহা বুঝাইয়া দেওয়া। হাজরার ঠাকুরকে ভাবিতে বারণ করায় তাঁহার দর্শন ও উত্তর
আবার কখনও কখনও বলা হইত - "আচ্ছা, বল দেখি, এই সব এদের (বালক ভক্তদিগকে লক্ষ্য করিয়া) জন্যে এত ভাবি কেন? এর কি হলো, ওর কি হলো না, এত সব ভাবনা হয় কেন? এরা তো সব ইস্কুল বয় (School boy); কিছুই নেই - এক পয়সার বাতাসা দিয়ে যে আমার খবরটা নেবে, সে শক্তি নেই; তবু এদের জন্যে এত ভাবনা কেন? কেউ যদি দুদিন না এসেচে তো অমনি তার জন্যে প্রাণ আঁচোড়-পাঁচোড় করে, তার খবরটা জানতে ইচ্ছা হয় - এ কেন?" জিজ্ঞাসিত বালক হয়তো বলিল, "তা কি জানি মশাই কেন হয়। তবে তাদের মঙ্গলের জন্যই হয়।"
ঠাকুর - কি জানিস, এরা সব শুদ্ধসত্ত্ব; কাম-কাঞ্চন এদের এখনও স্পর্শ করেনি, এরা যদি ভগবানে মন দেয় তো তাঁকে লাভ করতে পারবে, এই জন্যে! এখানকার (আমার) যেন গাঁজাখোরের স্বভাব; গাঁজাখোরের যেমন একলা খেয়ে তৃপ্তি হয় না - এক টান টেনেই কলকেটা অপরের হাতে দেওয়া চাই, তবে নেশা জমে - সেই রকম। তবু আগে আগে নরেন্দরের জন্যে যেমনটা হতো, তার মতো এদের কারুর জন্য হয় না। দুদিন যদি (নরেন্দ্রনাথ) আসতে দেরি করেছে তো বুকের ভিতরটায় যেন গামছায় মোচড় দিত! লোকে কি বলবে বলে ঝাউতলায়1 গিয়ে ডাক ছেড়ে কাঁদতুম। হাজরা2 (এক সময়ে) বলেছিল, 'ও কি তোমার স্বভাব? তোমার পরমহংস অবস্থা; তুমি সর্বদা তাঁতে (শ্রীভগবানে) মন দিয়ে সমাধি লাগিয়ে তাঁর সঙ্গে এক হয়ে থাকবে; তা না, নরেন্দ্র এল না কেন, ভবনাথের কি হবে - এ সব ভাব কেন?' শুনে ভাবলুম - ঠিক বলেছে, আর অমনটা করা হবেনি; তারপর ঝাউতলা থেকে আসচি আর (শ্রীশ্রীজগদম্বা) দেখাচ্ছে কি, যেন কলকাতাটা সামনে, আর লোকগুলো সব কাম-কাঞ্চনে দিনরাত ডুবে রয়েছে ও যন্ত্রণা ভোগ কচ্চে। দেখে দয়া এল। মনে হলো, লক্ষগুণ কষ্ট পেয়েও যদি এদের মঙ্গল হয়, উদ্ধার হয় তো তা করব। তখন ফিরে এসে হাজরাকে বললুম - 'বেশ করেছি, এদের জন্যে সব ভেবেছি, তোর কি রে শালা?'
1. রানী রাসমণির কালীবাটীর উত্তরাংশে অবস্থিত ঝাউবৃক্ষগুলি। উদ্যানের ঐ অংশ শৌচাদির জন্য নির্দিষ্ট থাকায় ঐ দিকে কেহ অন্য কোন কারণে যাইত না।↩
2. শ্রীযুত প্রতাপচন্দ্র হাজরা।↩