Prev | Up | Next

পঞ্চম খণ্ড - দ্বাদশ অধ্যায় - দ্বিতীয় পাদ: ঠাকুরের শ্যামপুকুরে অবস্থান

উপেন্দ্রের শ্যামপুকুরে আগমন ও ঠাকুরের সপ্রেম ব্যবহারে উপলব্ধি

"তাহার পর একদিন অপরাহ্ণে উপেনকে লইয়া যাইলাম। সেদিন ঠাকুরের ঘরে তাঁহার বিছানার নিকট হইতে দুটি সপ্ বিছাইয়া একঘর লোক বসিয়া, আর নানারকম আজে-বাজে কথা হইতেছে - যেমন, ছবি আঁকার কথা (কারণ, চিত্রবিদ্যাকুশল অন্নদা বাগচী সেদিন সেখানে ছিল), সেকরার দোকানে সোনারূপা গলানোর কথা1 ইত্যাদি। অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিলাম, (ঐরূপ কথা ভিন্ন) একটিও ভাল কথা হইল না! ভাবিতে লাগিলাম, আজ এই নূতন লোকটিকে লইয়া আসিলাম আর আজই যত আজে-বাজে কথা! ও (উপেন) ঠাকুরের সম্বন্ধে কিরূপ ভাব লইয়া যাইবে! - ভাবিয়া আমার মুখ শুষ্ক হইতে লাগিল এবং মধ্যে মধ্যে উপেনের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া দেখিতে লাগিলাম। কিন্তু যতবার দেখিলাম, দেখিলাম তাহার মুখ বেশ প্রসন্ন - যেন ঐসকল কথায় সে বেশ আনন্দ পাইতেছে। তখন ইশারা করিয়া তাহাকে উঠিতে বলিলাম, সে তাহাতে আর একটু বসিতে ইশারায় জানাইল। ঐরূপে দুই-তিনবার ইশারা করার পরে সে উঠিয়া আসিল। তখন তাহাকে বলিলাম, 'কি শুনছিলি এতক্ষণ? ঐসব কথায় শুনিবার কি আছে বল দেখি? - সাধে তোকে বাঙাল বলি!' তাহার কপালে একটি উল্কির টিপ ছিল বলিয়া তাহাকে আমরা ঐরূপ বলিতাম। সে বলিল, 'না হে, বেশ শুনিতেছিলাম। পূর্বে universal love (সকলের প্রতি সমান ভালবাসা) কথাটা শুনিয়াছি, কিন্তু কাহাতেও উহার প্রকাশ দেখি নাই। সকল বিষয় লইয়া সকলের সঙ্গে উঁহাকে (ঠাকুরকে) আনন্দ করিতে দেখিয়া আজ তাহা প্রত্যক্ষ করিলাম। কিন্তু আর একদিন আসিতে হইবে - আমার তিনটি প্রশ্ন আছে, জিজ্ঞাসা করিব।'"


1. সেকরাদিগের সোনারূপা চুরি করিবার দক্ষতা সম্বন্ধে ঠাকুর আমাদিগকে একটি মজার গল্প সময়ে সময়ে বলিতেন। অতুলবাবু এখানে ঐ গল্পটির ইঙ্গিত করিয়াছেন। গল্পটি ইহাই - কয়েকজন বন্ধু সমভিব্যাহারে এক ব্যক্তি একখানি গহনা বিক্রয়ের জন্য এক স্বর্ণকারের দোকানে উপস্থিত হইয়া দেখিল, তিলকাঙ্কিত-সর্বাঙ্গ শিখামাল্যধারী বৃদ্ধ স্বর্ণকার সম্মুখে বসিয়া গম্ভীরভাবে হরি-নাম করিতেছে এবং তাহার তিন-চারিজন সহকারী ঐরূপ তিলকমাল্যাদি ধারণ করিয়া গৃহমধ্যে নানাবিধ অলঙ্কারগঠনে নিযুক্ত আছে। বৃদ্ধ স্বর্ণকার ও তাহার সহকারীদিগের সাত্ত্বিক বেশভূষা দেখিয়া ঐ ব্যক্তি ও তাহার বন্ধুগণ ভাবিল - ইহারা ধার্মিক, আমাদিগকে ঠকাইবে না। পরে যে অলঙ্কারখানি তাহারা বিক্রয় করিতে আসিয়াছিল, তাহা বৃদ্ধের সম্মুখে রাখিয়া উহার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জন্য অনুরোধ করিল। বৃদ্ধও তাহাদিগকে সাদরে বসাইয়া একজন সহকারীকে তামাকু দিতে বলিল এবং কষ্টিপাথরে কষিয়া অলঙ্কারের স্বর্ণের দাম বলিয়া তাহাদিগের অনুমতি গ্রহণপূর্বক উহা গলাইবার নিমিত্ত গৃহমধ্যস্থ এক সহকারীর হস্তে প্রদান করিল। সেও উহা তৎক্ষণাৎ গলাইতে আরম্ভ করিয়া সহসা দেবতার স্মরণপূর্বক বলিয়া উঠিল, 'কেশব, কেশব।' ঈশ্বরীয় ভাবের উদ্দীপনায় বৃদ্ধও সঙ্গে সঙ্গে বলিয়া উঠিল, 'গোপাল, গোপাল।' গৃহমধ্যস্থ এক সহকারী উহার পরেই বলিয়া উঠিল, 'হরি, হরি, হরি।' যে তামাকু আনিয়াছিল সে ইতিমধ্যে কলিকাটি আগন্তুকদিগকে প্রদানপূর্বক গৃহমধ্যে প্রবেশ করিতে করিতে বলিয়া উঠিল, 'হর, হর, হর।' ঐরূপ বলিবামাত্র প্রথমোক্ত সহকারী কতকটা গলিত স্বর্ণ সম্মুখস্থ বারিপূর্ণ পাত্রে দক্ষতার সহিত নিক্ষেপ করিয়া আত্মসাৎ করিল। স্বর্ণকার ও তাহার সহকারিগণ শ্রীভগবানের পূর্বোক্ত নামসকল যে ভিন্নার্থে ব্যবহার করিতেছে, অর্থাৎ 'কেশব' না বলিয়া 'কে সব' - ইহারা চতুর অথবা নির্বোধ, এই কথা জিজ্ঞাসা করিতেছে এবং ঐ প্রশ্নের উত্তরস্বরূপেই 'গো-পাল' অথবা গরুর পালের ন্যায় নির্বোধ, এই কথা বলিতেছে এবং 'হরি' ও 'হর' শব্দদ্বয় অপহরণ 'করি' ও 'কর', এই অর্থে উচ্চারণ করিতেছে - একথা বুঝিতে না পারিয়া আগন্তুক ব্যক্তিগণ ইহাদিগের ভক্তি ও ধর্মনিষ্ঠায় প্রীত হইয়া নিশ্চিন্তমনে তামাকু সেবন করিতে লাগিল। অনন্তর গলিত স্বর্ণ ওজন করাইয়া উহার মূল্য লইয়া তাহারা প্রসন্নমনে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিল।

ঠাকুরের পরমভক্ত অধরচন্দ্র সেনের ভবনে বঙ্গের সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক শ্রীযুত বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত যেদিন তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, সেদিন বঙ্কিমবাবু সন্দেহবাদীর পক্ষাবলম্বনপূর্বক ঠাকুরকে ধর্মবিষয়ক নানা কূট প্রশ্ন করিয়াছিলেন। ঠাকুর ঐসকলের যথাযথ উত্তর দিবার পরে বঙ্কিমচন্দ্রকে পরিহাসপূর্বক বলিয়াছিলেন, "তুমি নামেও বঙ্কিম, কাজেও বঙ্কিম।" প্রশ্নসকলের হৃদয়স্পর্শী উত্তরলাভে প্রীত হইয়া বঙ্কিমবাবু বলিয়াছিলেন, "মহাশয়, আপনাকে একদিন আমাদের কাঁঠালপাড়ার বাটীতে যাইতে হইবে, সেখানে ঠাকুরসেবার বন্দোবস্ত আছে এবং আমরা সকলেও হরিনাম করিয়া থাকি।" ঠাকুর তাহাতে রহস্যপূর্বক বলিয়াছিলেন, "কেমনতর হরিনাম গো, সেকরাদের মতো নয় তো?" - বলিয়াই পূর্বোক্ত গল্পটি বঙ্কিমচন্দ্রকে বলিয়াছিলেন এবং সভামধ্যে হাস্যের রোল উঠিয়াছিল।

Prev | Up | Next


Go to top